আমদানি কমছে প্রধান ভোগ্যপণ্যের

দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে আমদানি ও এলসি (ঋণপত্র) খোলার হার হঠাৎই কমে গেছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো সতর্কতামূলক অবস্থান নেয়ায় সয়াবিন ও পাম অয়েলসহ নিত্যপণ্যের আমদানিতে এ ভাটা তৈরি হয়েছে।

দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে আমদানি ও এলসি (ঋণপত্র) খোলার হার হঠাৎই কমে গেছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো সতর্কতামূলক অবস্থান নেয়ায় সয়াবিন ও পাম অয়েলসহ নিত্যপণ্যের আমদানিতে এ ভাটা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে নিত্যদিনই ভোজ্যতেলের দাম ওঠানামা করছে। কিন্তু সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করতে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। ফলে ঝুঁকি বিবেচনায় ভোজ্যতেলের চাহিদা অনুযায়ী ঋণপত্র (এলসি) খোলায় সক্রিয় হচ্ছেন না উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) তথ্য বলছে, দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে রমজানে মাসিক চাহিদা পৌঁছে যায় প্রায় তিনলাখ টন পর্যন্ত। বড় আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সয়াবিন ও পাম মিলিয়ে অন্তত চার থেকে সাড়ে চার লাখ টন তেল আমদানির বিপরীতে এলসি খোলার প্রয়োজন ছিল। অথচ এ সময়ে এলসি খোলা হয়েছে মাত্র তন লাখ টনের জন্য। পাম অয়েল পরিশোধিত অবস্থায় আনা হলেও এলসি খোলার পর সয়াবিন তেল দেশে এনে পরিশোধনের পর বাজারজাত করতে প্রায় দুই-আড়াই মাস সময় লেগে যায়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) দেশে চার লাখ টন পরিশোধিত পাম ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের শুল্কায়ন হয়ে বন্দর থেকে খালাস হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ শুল্কায়নের পরিমাণ ছিল সাড়ে তিন লাখ টন। ভোজ্যতেলের প্রায় পুরোটাই বর্তমানে আমদানি করছে টি কে গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)।

আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক মাস ধরে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বেড়ে চলেছে। বিশ্ববাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি তাদের মধ্যে সংশয় তৈরি করেছে। কারণ সরকার কোনো পণ্যের দাম বেঁধে দিলে এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে তা হালনাগাদ করা না হলে আমদানিকারকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হন। এ আস্থার সংকটের কারণেই মূলত ভোজ্যতেল আমদানির ঋণপত্র খোলার হার গত দুই মাসে অনেক কমে গেছে।

টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত দুই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। জুনে টনপ্রতি সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ডলার, এখন সেটা ১ হাজার ২০০ ডলারে পৌঁছেছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতি মাসের শেষে নিয়ম করে তদারকি না হলেও এ অবস্থায় তেল এনে গুদামজাত করে বসে থাকার উপায় নেই ব্যবসায়ীদের। ব্যাংক থেকে শুরু করে অন্যান্য অর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করে ফেলতে হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘সরকার যেহেতু দাম নিয়ন্ত্রণ করছে, তাই প্রতি মাসে আমদানি তথ্য হালনাগাদ করে মূল্য সমন্বয় করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশেও বাড়ানো হোক, আবার কমলে এখানে কমানো হোক। সময়মতো দাম সমন্বয় না হলে আমাদের প্রচুর লোকসান গুনতে হয়। হিসাব করলে দেখা যায়, যে পরিমাণ এলসি খোলা হয়েছে তাতে এখনো অন্তত দুই লাখ টন ভোজ্যতেলের ঘাটতি রয়েছে। আর সেপ্টেম্বর, অক্টোবরে এলসি খোলার হার চাহিদা অনুযায়ী না করা গেলে তো রোজার আগে বড় সংকট দেখা দেবে।’

পাম অয়েল পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করে সরাসরি বাজারে দেয়া গেলেও সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। শুল্কায়ন শেষে ট্যাংক টার্মিনালে সংরক্ষণ করতে হয়। এরপর কারখানায় নিয়ে পরিশোধনের পর বাজারজাত করতে সব মিলিয়ে দুই-আড়াই মাস সময় লেগে যায়।

আমদানি কমেছে দেশের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য গমেরও। দেশে প্রতি বছর গমের চাহিদা রয়েছে ৭০-৭৫ লাখ টন। এর প্রায় ১৫ শতাংশ দেশে উৎপাদন হলেও বাকিটা আমদানি করতে হয়।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে শুল্কায়ন হয়েছে ৬ লাখ ১৩ হাজার টন গম। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭ লাখ ৫২ হাজার টন। অর্থাৎ এ সময়ে গমের আমদানি কমেছে ১৮ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে আমদানি হওয়া গমের প্রায় ৬৫ শতাংশই আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে।

ডেল্টা এগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্রয়ক্ষমতা বিশ্লেষণ করলে একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব। কারণ এ দুই শ্রেণীর ভোক্তা পর্যায়ে বিগত সময়ে গমের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া আমাদের গম আমদানির বড় উৎস। সেখানকার বন্দর থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা একটা বাধার মুখে পড়েছে। আর বিশ্ববাজারে এখন ভোজ্যতেলের দাম বাড়তি। এখন এ বাড়তি দামে তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের পর বিক্রি করার সময় সঠিকভাবে দামের সমন্বয় হবে কিনা সে নিশ্চয়তা মিলছে না। ফলে লোকসানের ঝুঁকি এড়াতে ভোজ্যতেল আমদানিতে এলসি খোলার ক্ষেত্রে অতিসতর্কতা দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে দামের সমন্বয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তৈরি হওয়া গ্যাপগুলো দূর করতে হবে।’

তেল ও গম আমদানির হার কমলেও বেড়েছে চিনি আমদানি। এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূলত বিশ্ববাজারে কাঁচা চিনির দাম স্বাভাবিক থাকায় দেশের বাজারে আমদানি সরবরাহও স্বাভাবিক রয়েছে। এছাড়া সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আনা চিনির ব্যাপারে আগের চেয়ে নজরদারি বেড়েছে। ফলে এখন বৈধপথে শুল্ক-কর পরিশোধ করে যে চিনি আমদানি হচ্ছে সেটি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এনবিআরের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে ২ লাখ ৩৩ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ।

স্থানীয়ভাবে চিনি উৎপাদিত হয় মোট চাহিদার মাত্র ১ শতাংশ। বছরে দেশে চিনি আমদানি হয় ২০-২২ লাখ টন। দেশের চিনির বাজারের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধনের মাধ্যমে বাজারজাত করছে মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, এস আলম, দেশবন্ধু ও আবদুল মোনেম।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে চিনির দাম স্বাভাবিক আছে। গমের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে যে গত মাসে ১৫-২০ দিন দেরি করে গম এসেছে। রাশিয়ার বন্দরে জট থাকায় সময়মতো গম এসে পৌঁছেনি।’

ভোজ্যতেল আমদানি পরিস্থিতি নিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘পাশের দেশগুলোয় খবর নিলে দেখা যাবে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে সেসব দেশে সরকারের তদারকিতে স্থানীয় বাজারেও তেলের দাম বাড়ানো হয়। একইভাবে বিশ্ববাজারে কমলে স্থানীয় বাজারেও ভোজ্যতেলের দাম কমানো হয়। আমাদের কথা হলো বিশ্ববাজারে যখন যে দাম সেটার সঙ্গে মিলিয়ে সমন্বয় করে দিলেই হয়। এতে ভোজ্যতেলের বাজারে চাহিদা ও জোগান স্বাভাবিক থাকবে। আর দাম অ্যাভারেজ করার যে কথাটা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় সেটা কীভাবে সম্ভব! একেকজন আমদানিকারকের ক্রয়মূল্যে ভিন্নতা থাকে। ভোগ্যপণ্যের আমদানিকারকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তাই ভিন্ন ভিন্ন দামে কেনা পণ্য ব্যবসায়ীরা তো কোনো অ্যাভারেজ দামে বিক্রি করতে পারেন না।’

আরও